জেলা প্রশাসন
left_menu_pic
Joomla Slide Menu by DART Creations
left_menu_footer
শিল্প ও বাণিজ্য

যশোর জেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প নির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত। ১৯৬০ সালের পরবর্তী সময়ে এখানে বড় বড় কিছু শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে টেক্সটাইল মিল, তাঁত, ধান কল, চিরুনী কারখানা, ময়দা কল, কাঠের কল, বরফ কল, অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরি, বিড়ি ফ্যাক্টরি, মোমবাতির ফ্যাক্টরি, প্রিন্টিং প্রেস, তেল কল, বেকারী, ছাপাখানা ও বাঁধাই কারখানা, ব্যাটারী ফ্যাক্টরি অন্যতম। জেলায় কয়টি উলেলখযোগ্য পাটকল রয়েছে। এরমধ্যে পূর্বাচল পাটকল, নওয়াপাড়া পাটকল, কার্পেটিং পাটকল এবং যশোর পাটকলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মধ্যে বাঁশ, বেত, কাঠের কাজ, যন্ত্রাংশ ঝালাই কারখানা, রিক্সা-রেডিও-টিভি মেরামত কারখানা, জাল তৈরী, কামার ইত্যাদির কথা বলা যায়। জেলার সর্বত্র হসত্মচালিত তাঁতের বিসত্মার লক্ষণীয়। জেলায় ৮০৪টি মাছের খামার, ১৩২টি পশুসম্পদ খামার, ১,০৬৪টি হাঁস মুরগীর খামার ও ৩৯টি হ্যাচারী রয়েছে। এ ছাড়া অভয়নগরের তালতলা হাটের চামড়া ট্যানিং কারখানা ‘‘এস.এ.এফ ইন্ডাস্ট্রিজ’’, আটটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ভোজ্যতেল ও সাবান তৈরির কারখানা, বোতাম, অলংকার ও চুন তৈরির কারখানা উলেলখযোগ্য। বাংলাদেশের অন্যতম গুড় উৎপাদনকারী জেলা যশোর এবং এটি একটি উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্প। আঠার শতকের শেষার্ধে এই জেলা খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। কেননা সে সময়ে যশোরের উৎপাদিত গুড় কলকাতায় চালান দেয়া হতো।

সেইসাথে আখের গুড়ও পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হতো। উল্লেখ্য, খেজুর গুড়ের লাভজনক ব্যবসায় আকৃষ্ট হয়েই কয়েকজন ইংরেজ ব্যবসায়ী জেলার কেশবপুর, চৌগাছায় খেজুর গুড়ের কারখানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এখানে মোট ৭,১৯৩টি গুড় তৈরির কারখানা রয়েছে। যশোরের উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মধ্যে অন্যতম তাঁতশিল্প। বর্তমানে জেলার কয়েক লক্ষ মানুষ তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল। জেলার কোন কোন জায়গায় তাঁতশিল্প পরিবারভিত্তিক মালিকানায় পরিচালিত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যৌথ ও সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগে তা পরিচালিত হচ্ছে। শাড়ি, মশারি, তোয়ালে, গামছা, লুঙ্গি তৈরি হয় এ সমসত্ম তাঁতে। ১৯৬১ সালে যশোরের নওয়াপাড়ায় গড়ে ওঠা ‘‘বেঙ্গল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড’’ জেলার বৃহদায়তন শিল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার এটিকে জাতীয়করণ করেন এবং তারপর থেকেই এটি ‘‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন’’-এর উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে।

বিলুপ্তপ্রায় শিল্প : যশোর জেলা একসময় উপমহাদেশে চিরুনী শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং ১৯০১ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যমত্ম চিরুনী ব্যবসায় যশোর ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯০১ সালে ‘‘কম্বস এ্যান্ড সেলুলয়েড ওয়ার্কস’’ নামের কারখানাটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যশোরে চিরুনী শিল্পের সূত্রপাত ঘটে। তখন ভারত থেকে আমদানি করা মহিষের শিং থেকে অতি উনড়বতমানের চিরুনি তৈরি হত। পাক-ভারত বিভক্তির পরে মহিষের শিং রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া, ভারতীয় স্বল্প মূল্যের চিরুনীর বাজারদখল, সেলুলয়েডের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদনের উপর অপরিমিত কর আরোপ চিরুনী শিল্পকে মলান করে দেয়। এখনও জেলায় কয়টি চিরুনী কারখানা রয়েছে, তবে আগের মতো বড় কলেবরে নয়।

একই সময়ে তারা বেশ কয়টি চিনির কল স্থাপন করে। কিন্তু ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে সেই কারখানাগুলোতে চিনির পরিবর্তে দেশীয় মদ তৈরি শুরু হয়। উল্লেখ্য, চিনিশিল্পে ইংরেজরা মার খেলেও ইংরেজরাই প্রথম এই জেলার মানুষকে চিনি শিল্পে আকৃষ্ট করে। এ প্রসঙ্গে জেলা গেজেটিয়ার-এ উল্লেখ করা হয়েছে ‘‘ব্রিটিশদের ছাড়া চিনি শিল্প গড়ে ওঠার পরই স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই শিল্পে এগিয়ে আসে। ‘‘ময়রা’’ বা মিষ্টি প্রস্ত্ততকারীরা এতে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। ফলে একসময় তারা চিনি ব্যবসাকে তাদের এক চেটিয়া ব্যবসায় পরিণত করে। ১৮৮০ সাল পর্যমত্ম এই ধারা অব্যাহত ছিল’’। তবে আমদানী করা চিনি দামে সসত্মা হবার কারণে দেশীয় চিনির কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। আর তাই ১৯০১ সালের ১১৭টি কারখানা মাত্র ২৩ বছরের ব্যবধানে ১৯২৪-এ ৫০টিতে নেমে আসে। বর্তমানে চিনির কারখানা নেই বললেই চলে। যশোর জেলা একসময় ইংরেজরা নীল চাষের প্রসার ঘটায়। সদর উপজেলা নীল চাষের উলেলখযোগ্য কেন্দ্র ছিল। রূপদিয়ায় প্রথম নীল কারখানা স্থাপিত হয়। ১৮৬৮-৬৯ সালের জরীপে জানা যায় সেই সময়ে জেলার দুই লাখ বিঘা জমিতে নীল চাষ করা হতো এবং ১৮৯৫-৯৬ সালে জেলায় ১৭টি নীল কুঠি ছিল (যশোহর খুলনার ইতিহাস, ৩১)। কিন্তু নীলকরদের অত্যাচার ও প্রতাপের কারণে একসময় নীলচাষীদের সাথে দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু হয় এবং কালক্রমে নীল চাষ বন্ধ হয়ে যায়।

সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা

বেনাপোল বন্দর ব্যবস্থাপনা : বেনাপোল বন্দরে অনিয়ম আজ একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই মাল খালাসে প্রায়ই বিলম্ব হয়। শত শত ভারতীয় ট্রাক বেনাপোল বন্দরের ২৭টি শেডে আটকে পড়ে থাকে। দৈনিক ৩০০টি ভারতীয় ট্রাক বেনাপোল স্থলবন্দরে প্রবেশ করে। আমদানীকারকরা সময় মতো মাল খালাস করতে না পারলে সেখানে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের চোখে ফাঁকি দিয়ে বিপুল পরিমাণে পণ্যদ্রব্য ও দাহ্যপদার্থ যেমন এসিড আমদানি ও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

পণ্য বাজারজাতকরণের সমস্যা : বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)-র তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘‘যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ’’ মারাত্মক অর্থ সংকটের মুখে রয়েছে। প্রয়োজনমাফিক পাট কিনতে ব্যর্থ হওয়ায় ও কোটি টাকা মূল্যের ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য বিক্রয় করতে না পারায় পাটকলটি নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

ফুলের বাজারজাতকরণ : জেলার ফুল চাষীরা ন্যায্য বাজারদর এবং আর্থিক সহায়তার অভাবে ফুল চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। যশোর সীমামেত্ম পাচার হয়ে আসা ভারতীয় ফুলে ছেয়ে যাচ্ছে স্থানীয় বাজার।

সম্ভাবনা ও সুযোগ

এ ছাড়া জেলার ৮টি উপজেলায় ৮টি শিল্পাঞ্চল করা যেতে পারে। শিল্পাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত শিল্প কারখানায় জেলায় প্রাপ্ত কাঁচামাল যেমন, মাছ, কাঠ, অন্যান্য সামুদ্রিক কাঁচামাল, কৃষিপণ্য ইত্যাদি ব্যবহৃত হবে। রাস্তা-ঘাট, বন্দর, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে উপজেলার প্রবাসী ব্যক্তিবর্গকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সম্ভব। উপজেলার প্রবাসী বাংলাদেশীগণ একদিকে যেমন বিনিয়োগ করতে পারবে অন্যদিকে প্রবাসে থাকার কারণে রপ্তানিতে ভূমিকা রাখতে পারবে। বস্ত্তত, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে এই উদ্যোগ যশোরের অর্থনীতিতে বিরাট সাফল্য নিয়ে আসবে।